ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় এশিয়ার অধিকাংশ শেয়ার সূচক

আগামী সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) সুদহার কমাতে যাচ্ছে বলে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা এখন আরো জোরালো হচ্ছে।

আগামী সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) সুদহার কমাতে যাচ্ছে বলে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা এখন আরো জোরালো হচ্ছে। এতে ঋণের সুদ কমবে এবং অর্থনীতিতে নতুন করে গতি আসবে বলে মনে করছেন বিনিয়োগকারীরা। এর ধারাবাহিকতায় গতকাল এশিয়ার শেয়ারবাজারে অধিকাংশ সূচকে দেখা গেছে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা। খবর রয়টার্স।

সপ্তাহজুড়েই পুঁজিবাজারে এ ধারা দেখা গেছে। বৈশ্বিক সূচক এমএসসিআই অল কান্ট্রি ওয়ার্ল্ড ইনডেক্স পুরো সপ্তাহে বেড়েছে ১ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে একই সঙ্গে স্বর্ণের দাম প্রায় রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এখনো যে কাটেনি, সে বিষয়ে ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এশিয়া-প্যাসিফিকের বৃহৎ সূচকগুলোর মধ্যে এ প্রতিবেদন লেখার সময় গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত (বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী) বৈশ্বিক শেয়ারবাজার সূচক এমএসসিআই অল কান্ট্রি ইনডেক্স বেড়েছে দশমিক ১১ শতাংশ। এ সময় এশিয়ার প্রধান শেয়ার সূচকগুলোর মধ্যে জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক দশমিক ৮৯ শতাংশ বেড়ে ৪৪ হাজার ৭৬৮ দশমিক ১২ পয়েন্টে পৌঁছেছে। অস্ট্রেলিয়ার এসঅ্যান্ডপি/এএসএক্স সূচক দশমিক ৬৩ শতাংশ বেড়ে পৌঁছেছে ৯ হাজার ১২৮ দশমিক ৭০ পয়েন্টে। ভারতে দশমিক ৪৪ শতাংশ বেড়ে ৮১ হাজার ৯০৪ দশমিক ৭০ পয়েন্টে পৌঁছেছে বিএসই সেনসেক্স সূচক। একই সময় হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক ১ দশমিক ১৬ শতাংশ বেড়ে ২৬ হাজার ৩৮০ পয়েন্ট ছাড়িয়ে যায়। তবে সাংহাই কম্পোজিট সূচক গতকাল দশমিক ১২ শতাংশ কমে পৌঁছেছে ৩ হাজার ৮৭০ দশমিক ৬০ পয়েন্টে।

বিশ্লেষকদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের আয় অনেক বাড়বে এমন প্রত্যাশাই বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়িয়েছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ার কেনাবেচা বেড়েছে, যা পুরো পুঁজিবাজারেই ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ভূমিকা রেখেছে।

ইউরোপের শেয়ারবাজারে গতকাল লেনদেনের শুরুতে শেয়ারসূচক সামান্য কমে দশমিক ২ শতাংশ নেমে যায়। যুক্তরাষ্ট্রে নাসডাক ও এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ফিউচার সূচক আগের রাতে নতুন উচ্চতায় উঠলেও গতকাল আবার সামান্য কমে দশমিক ১ থেকে দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসে।

বৈশ্বিক পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে এখনো প্রভাব ফেলছে যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বল কর্মসংস্থান পরিসংখ্যান। গত সপ্তাহে প্রকাশিত ওই তথ্য থেকে দেশটির শ্রমবাজারের শ্লথতা স্পষ্ট হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, এ পরিস্থিতিতে ফেডের সুদহার কমানো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

আমুন্ডির সিনিয়র পোর্টফোলিও ম্যানেজার আমেলি দেরাম্বুরে বলেন, ‘চাকরির বাজারে শ্লথতা থাকলেও বিনিয়োগকারীরা এখনো ফেডের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছে। তারা মনে করছেন, এ সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে অর্থনীতিতে নতুন গতি দেবে।’

সিটি ব্যাংকের অর্থনীতিবিদ ভেরোনিকা ক্লার্ক জানান, আগামী পাঁচ বৈঠকে ফেড মোট ১২৫ বেসিস পয়েন্ট সুদহার কমাতে পারে বলে তাদের ধারণা। ফিউচার মার্কেটেও একই ইঙ্গিত মিলছে। তাদের হিসাবে, আগামী সপ্তাহে ২৫ বেসিস পয়েন্ট কমে সুদহার ৪ থেকে ৪ দশমিক ২৫ শতাংশে নামার সম্ভাবনা ৯৩ শতাংশ। ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমার সম্ভাবনা মাত্র ৭ শতাংশ।

ফেডের সুদহার কমার প্রত্যাশা বন্ডবাজারেও প্রভাব ফেলেছে। গত বৃহস্পতিবার ১০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড ৪ শতাংশের নিচে নেমেছিল। তবে গতকাল আবার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক শূন্য ৪৩ শতাংশে।

অন্যদিকে মুদ্রাবাজারে ডলারের মান কিছুটা বেড়েছে। ডলার সূচক দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৭ দশমিক ৭৫৭-এ। জাপানি ইয়েনের বিপরীতে ডলার আরো শক্তিশালী হয়েছে। ইয়েনের বিপরীতে ডলারের বিনিময় হার শক্তিশালী হয়েছে দশমিক ৫ শতাংশ। প্রতি ডলার হাতবদল হয়েছে ১৪৭ দশমিক ৮৯ ইয়েনে।

জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছেন, তারা মুদ্রার মান নিয়ন্ত্রণে সরাসরি হস্তক্ষেপ করবেন না। এতে মুদ্রাবাজারে ইয়েন দুর্বল হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে ইউরোর বিনিময় হার সামান্য কমে ১ দশমিক ১৭ ডলার হয়েছে। যদিও গত বৃহস্পতিবার ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ইসিবি) সুদহার অপরিবর্তিত রাখার ঘোষণা দিলে ইউরোর বিনিময় হার কিছুটা শক্তিশালী হয়।

জেপি মর্গ্যানের অর্থনীতিবিদ গ্রেগ ফুজেসি জানিয়েছেন, ইসিবি নীতি পরিবর্তনে তাড়াহুড়া করবে না। তাই তাদের চূড়ান্ত সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত ডিসেম্বরের বৈঠকের আগে আসবে না।

ব্রিটিশ অর্থনীতি চাপে পড়ার খবরও এসেছে। দেশটির জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে অর্থনীতিতে কোনো প্রবৃদ্ধি হয়নি। শিল্প খাতে উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এতে পাউন্ডের বিনিময় হার দশমিক ৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১ ডলার ৩৫ সেন্টে।

জ্বালানি তেলের বিশ্ববাজার এখন দুর্বল অবস্থায় আছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) জানিয়েছে, আগামী বছর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ রেকর্ড পরিমাণে বেড়ে যাবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ফেডের সুদহার কমানোর প্রত্যাশা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়িয়েছে এবং বৈশ্বিক শেয়ারবাজারকে উজ্জীবিত করেছে। তবে একই সঙ্গে স্বর্ণের উচ্চমূল্য ও জ্বালানি তেলের বাজারে সরবরাহ চাপে বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তার সংকেত স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

আরও